ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে দেবে—এমনটাই বিশ্বাস করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তবে কয়েক মাসের সংঘাতের পর পরিস্থিতি তাদের প্রত্যাশার বিপরীত দিকে মোড় নিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুদ্ধের শুরুতে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব ধারণা করেছিল, অর্থনৈতিক সংকট ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে দুর্বল হয়ে পড়া ইরানি শাসনব্যবস্থা দ্রুত ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে ইরান টিকে থাকার সক্ষমতা দেখিয়েছে এবং সংঘাত এখন দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার দিকে এগোচ্ছে।
সম্প্রতি ইরানের হাতে একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। যদিও হেলিকপ্টারের ক্রুরা বেঁচে গেছেন, তবুও ঘটনাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরান এখনও যুক্তরাষ্ট্রকে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করার সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে শক্ত অবস্থান প্রদর্শন করতে চাইছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনার পথও খোলা রাখতে আগ্রহী। বিশেষ করে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করা যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি।
অন্যদিকে নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন যে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি ইরান। হামাস, হিজবুল্লাহ এবং সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর তিনি মনে করেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ দ্রুত ফল দেবে। তবে সেই হিসাব বাস্তবে সফল হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু উভয়েই ইরানি শাসনব্যবস্থার স্থিতিশীলতা, কৌশলগত সক্ষমতা এবং ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতাকে অবমূল্যায়ন করেছিলেন। সামরিক শক্তির মাধ্যমে দ্রুত রাজনৈতিক পরিবর্তন আনার যে পরিকল্পনা ছিল, তা এখন জটিল বাস্তবতার মুখে পড়েছে।
এদিকে যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতেও। তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতের ক্ষতির পাশাপাশি বিনিয়োগ ও পর্যটন খাতেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলা উপসাগরীয় দেশগুলো এখন নতুন ঝুঁকির মুখে।
ইরানের নেতৃত্ব মনে করছে, হরমুজ প্রণালিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক প্রভাব ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে তারা লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলি হামলা বন্ধ করার বিষয়টিকেও যেকোনো কূটনৈতিক সমাধানের সঙ্গে যুক্ত করছে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার পরিবর্তে আরও দীর্ঘ ও জটিল রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক অগ্রগতি না হলে হরমুজ প্রণালির সংকট এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে।
0 Comments